জীববিদ্যা বা বায়োলজি (Biology)হল বিজ্ঞানের একটি শাখা যেখানে জীবন্ত প্রাণী এবং তাদের জীবন প্রক্রিয়া সম্পর্কে গবেষণা করা হয়। এটি একটি ব্যাপক বিজ্ঞান যা বিভিন্ন ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেমন- উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা, জিন প্রকৌশল ইত্যাদি.
জীববিদ্যা বা বায়োলজির মূল বিষয়গুলি হল:-
জীবের গঠন:-কোষ, টিস্যু, অঙ্গ, এবং অঙ্গসংস্থার গঠন.
জীবের কার্যকারিতা:-শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যেমন শ্বসন, হজম, এবং সঞ্চালন.
জীবের বৃদ্ধি ও বিবর্তন:-জীবদেহের বৃদ্ধি এবং বিবর্তনের ধারা.
জীবের বংশগতি:-জিন এবং বংশগতির নিয়মাবলী.
জীবের সম্পর্ক:-জীব এবং পরিবেশের মধ্যে সম্পর্ক এবং বাস্তুসংস্থান.
জীববিদ্যার বিভিন্ন শাখা রয়েছে, যেমন: -
উদ্ভিদবিদ্যা:- উদ্ভিদ সম্পর্কিত গবেষণা.
প্রাণীবিদ্যা:- প্রাণী সম্পর্কিত গবেষণা.
কোষ জীববিদ্যা:- কোষের গঠন ও কার্যাবলী নিয়ে গবেষণা.
জিন প্রকৌশল:- জিন এবং ডিএনএ DNA নিয়ে কাজ.
বাস্তুবিদ্যা:- পরিবেশ ও জীবন্ত প্রাণীর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা.
মাইক্রোবায়োলজি:- জীবাণু সম্পর্কিত গবেষণা.
শারীরবিদ্যা:- জীবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং কার্যাবলী নিয়ে গবেষণা.
জীববিদ্যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যেমন:
স্বাস্থ্যসেবা:-রোগের কারণ, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধে সাহায্য করে.
কৃষি:-ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে.
শিল্প:-খাদ্য, ঔষধ এবং অন্যান্য শিল্পে ব্যবহৃত হয়.
পরিবেশ সুরক্ষা:-পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সাহায্য করে।
কোষ (The Cell):- কোষ হল প্লাজমা পর্দা দ্বারা আবৃত গ্রোটোপ্লাজমের অংশ। এটি হল জীবের গঠনগত ও কার্যগত একক।কোষ হল ক্ষুদ্রতম জীবিত একক যা জীবনের সর্বপ্রকার কার্যকারিতার বহিঃপ্রকাশ করতে সক্ষম।
প্লাজমা :- পদার্থের চতুর্থ অবস্থা কঠিন, তরল এবং গ্যাসের পর পদার্থের চতুর্থ অবস্থাকে প্লাজমা বলা হয়।
(Cytology)!:- জীবনবিজ্ঞানের যে শাখাতে কোষ নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে বলে সাইটোলজি (Cytology)!
❏ রবার্ট হুক 1665 সালে কোষ আবিষ্কার করেন। তিনি মাইক্রোগ্রাপিয়া প্রকাশিত করেন 1665 সালে।
❏ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রবার্ট হুক প্রথম 'Cell' বা কোষ শব্দটি ব্যবহার করেন যখন তিনি মাইক্রোস্কোপ বা অণুবীক্ষণ যন্ত্রে একটি কর্ক-কে দেখেছিলেন। বাস্তবে তিনি প্রকৃত জীবিত কোষ দেখেননি, তিনি দেখেছিলেন কিছু মৃত কোষ প্রাচীর।
❏অ্যান্টনি ভন্ লিউয়েনহক হলেন সেই প্রথম ব্যক্তি, যিনি অণুবীক্ষণ যন্ত্রে জীবিত কোষ দেখেছিলেন।
❏এম. স্লেইডেন এবং টি. সোয়ান প্রথম কোষতত্ত্ব (Cell theory) উপস্থাপন করেন।
❏সর্ববৃহৎ একক কোষ হল-উটপাখির অনিষিক্ত ডিম।
❏সবচেয়ে ছোটো কোষ হল-মাইকোপ্লাজমা গ্যালিসেপ্টিকাম (PPLO)।
❏সর্ববৃহৎ মনুষ্য কোষ হল-ডিম্বাশয়, আবার
❏সর্বদীর্ঘ মনুষ্য কোষ হল-স্নায়ু কোষ (Neuron)।
❏লোহিত রক্তকণিকা হল সর্বক্ষুদ্র মনুষ্য কোষ (Human Blood Cell)।
কোষের প্রকারভেদ :- প্রধানত দুই প্রকারের কোষ দেখতে পাওয়া যায়। যথা-প্রোক্যারিওটিক কোষ এবং ইউক্যারিওটিক কোষ।
প্রোক্যারিওটিক কোষ:--নিম্নশ্রেণির জীবে পাওয়া যায়।প্রোক্যারিওটিক কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস অনুপস্থিত থাকে। এক্ষেত্রে নিউক্রিয় পদার্থের সঙ্গে সাইটোপ্লাজমের প্রত্যক্ষ সংযোগ দেখতে পাওয়া যায়।
∎ ইউক্যারিওটিক কোষ:-উচ্চশ্রেণির জীবে এই কোষের উপস্থিতি লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে নিউক্রিয় পদার্থ একটি সুগঠিত পর্দাবৃত অবস্থায় থাকে।
❏RBC (Red Blood Cell) ও স্পার্ম সেল (শুক্রাণু কোষ)-গুলিতে এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকিউলাম অনুপস্থিত থাকে।
❏ব্যাকটেরিয়া, নীলাভ সবুজ শৈবাল, পরিণত শুক্রাণু ও প্রাণীদের RBC বা লোহিত রক্তকণিকাতে গলগি বডি পাওয়া যায় না।
প্লাস্টিড :- প্লাস্টিড হল একটি ঝিল্লি-আবদ্ধ অর্গানেল যা উদ্ভিদ, শৈবাল এবং কিছু ইউক্যারিওটিক জীব কোষে পাওয়া যায়। এটি রঙ্গক তৈরি ও সঞ্চয় এবং খাদ্য উৎপাদনে সহায়ক।
❏প্লাস্টিড হল একপ্রকার জীবিত কোষ অঙ্গাণু যা কেবলমাত্র উদ্ভিদ দেহে পাওয়া যায়। প্রধানত তিনপ্রকার পস্টিড দেখতে পাওয়া যায়। যথা-ক্লোরোপ্লাস্ট , লিউকোপ্লাস্ট , ক্রোমোপ্লাস্ট
প্লাস্টিডের প্রকারভেদ:-
ক্লোরোপ্লাস্ট (Chloroplast):-সবুজ রঙের, সালোকসংশ্লেষণে সাহায্য করে (সবুজ বর্ণের, এতে সালোকসংশ্লেষ ঘটে)।
লিউকোপ্লাস্ট (Leucoplast):-বর্ণহীন, খাদ্য সঞ্চয় করে [বর্ণহীন, এই অঙ্গাণুতে স্টার্চ (অ্যামাইলোপ্লাস্ট) বা লিপিড (ইলাইওপ্লাস্ট) এবং প্রোটিন (প্রোটিনোপ্লাস্ট) সঞ্চিত থাকে)।
ক্রোমোপ্লাস্ট (Chromoplast):-বিভিন্ন রঙের রঙ্গক সঞ্চয় করে, ফল, ফুল, পাতার রঙ গঠনে সাহায্য করে। (প্রধানত হলুদ বা কমলাবর্ণের রঞ্জক সমন্বিত, ফুল ও ফলের বর্ণের জন্য দায়ী)।
ক্রোমোপ্লাস্ট হল দুইপ্রকার। যথা-
(i) ক্যারোটিনয়েড:- জলে অদ্রাব্য, এটি হলুদ ও কমলা বর্ণের জন্য দায়ী। এটি গাজরে উপস্থিত।
(ii) অ্যান্থোসায়ানিন:- জলে দ্রাব্য, লাল ও নীল বর্ণের দায়ী। বিটরুট-এ উপস্থিত।
❏টম্যাটোর লাল বর্ণ লাইকোপেন নামক লাল বর্ণের রঞ্জকের জন্য হয়।
প্লাস্টিডের প্রধান কাজ:-
1.খাদ্য তৈরি (সালোকসংশ্লেষণ)।
2.খাদ্য সঞ্চয়।
3.উদ্ভিদদেহের রঙ প্রদান।
4.বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগ তৈরি।
লাইসোজোম :- যখন একটি ব্যাঙাচি মেটামরফোসিস প্রক্রিয়ার দ্বারা পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙে রূপান্তরিত হয় তখন তার ফুলকা ও লেজ লাইসোজোম দ্বারা পাচিত হয়। শুক্রাণুর মাথায় (head region)-থাকা লাইসোজোমাল উৎসেচকগুলি ডিম্বাণুর পর্দাকে পাচিত করে, ফলত ডিম্বাণুতে প্রবেশ করে ও তাকে নিষিক্ত করে।
কোষের বিভিন্ন অংশ:- কোষ প্রাচীর, কোষ পর্দা, এন্ডোপজমিক রেটিকিউলাম, মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগি বডি, লাইসোজোম, সেন্ট্রোজোম, নিউক্লিয়াস, প্লাস্টিড।
১.কোষ প্রাচীর:- শুধুমাত্র উদ্ভিদ কোর্সে পাওয়া যায়।
প্রকৃতি :- নিষ্প্রাণ, সেলুলোজ দ্বারা নির্মিত, ভেদ্যস্তর বর্তমান।
কাজ:- কোষকে দৃঢ়তা শক্তি প্রদান করে।
২. কোষ পর্দা:- উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় কোষে বিদ্যমান।
প্রকৃতি :-
রেচনতন্ত্র (Excretory System)
প্রাণিকোষে বিপাকের ফলে সৃষ্ট নাইট্রোজেন ঘটিত বর্জ্যপদার্থ রেচন প্রক্রিয়ায় দেহ থেকে নিষ্কাশিত হয়, যা অত্যন্ত দ্রুত ও নিয়মিত একটি প্রক্রিয়া। রেচন পদার্থ নিষ্কাশনের জন্য মানবদেহে সুনির্দিষ্ট অঙ্গ তন্ত্র রয়েছে যা রেচনতন্ত্র(Excretory System) নামে পরিচিত। রেচনতন্ত্রের সাহায্যেই ৮০ শতাংশ রেচন পদার্থ মানবদেহ থেকে বাহিরে চলে যায়। বাকি ১০ ভাগ রেচন পদার্থ সরাসরি নিষ্কাশিত না হয়ে বিভিন্ন ক্রিয়াকর্মে উৎপন্ন ও বিভিন্ন অঙ্গের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়। এগুলো সহকারী রেচন অঙ্গ হিসেবে পরিচিত। মানুষের রেচনতন্ত্রের প্রধান রেচন অঙ্গ হলো বৃক্ক(Kidney)।
রেচনতন্ত্রের কাজগুলো হচ্ছেঃ-
* রক্ত থেকে প্রোটিন বিপাকে সৃষ্ট নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য পদার্থ অপসারণ করা।
* দেহে এবং রক্তে পানির ভারসাম্য রক্ষা করা।
* রক্তে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ যেমন পটাসিয়াম,ক্যালসিয়াম,ফসফেট এবং ক্লোরাইডসহ বিভিন্ন লবনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা।
* রক্তে অম্ল-ক্ষারের ভারসাম্য রক্ষা করা।
* হরমোন ও এনজাইম নিঃসরণ করা।
* রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা।
রেচনতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত অঙ্গগুলো হচ্ছে বৃক্ক, ইউরেটর, রেনাল ধমনি ও শিরা, মূত্রথলি ও মূত্রনালি। বৃক্কের অসংখ্য নেফ্রন একদিকে রক্ত পরিশোধনের কাজ করে, অন্যদিকে ইউরেটর রক্তের সকল দূষিত পদার্থ মূত্রথলির দিকে নিয়ে যায়। এছাড়া রক্তে পানি ও আয়নসাম্য রক্ষার কাজও করে থাকে মানবদেহের রেচন সিস্টেম, চিকিৎসাবিজ্ঞানে যার নাম অসমোরেগুলেশন।

