পদার্থবিদ্যা (Physics)

 

সূচীপত্র:-

BY PRIYANSHU SINGHA

ভৌত রাশি:- বস্তু জগতে (Physical World) যা কিছু পরিমাপ করা যায়, তাকে ভৌত রাশি (ইংরেজি: Physical quantity) বা প্রাথমিক রাশি বলে। কোন ভৌত রাশি হল একটি বস্তু বা ঘটনার ভৌত ধর্ম যা পরিমাপ যোগ্য, যা পরিমাপ করা যায়।কোনও ভৌত রাশিকে প্রকাশ করা হয় একটি সংখ্যা এবং এক বা একাধিক এককের সমন্বয় হিসাবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কোনও বস্তুর ভর 50 Kg এখানে 50 হল সংখ্যা এবং কেজি (Kg) হল ভৌত রাশি ভরের একক।
একক (Unit) :- আমরা যে কোনও ভৌত রাশিকে পরিমাপ করি তার এককের সহায্যে। কোনও একটি ভৌত রাশির একক হল অদ্বিতীয়। 
উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, কোনও সুতোর দৈর্ঘ্য 2 মিটার, তাহলে এখানে ভৌত রাশিটি দৈর্ঘ্য, মান 2 এবং একক হল মিটার (m).
এককের ধরন:- একক সাধারণত দুই ধরণের হয়। যথা - ১. প্রাথমিক একক বা মূল একক, ২. লব্ধ একক।
প্রাথমিক একক বা মূল একক:-  যে সমস্ত রাশি স্বতন্ত্র এবং অদ্বিতীয় এবং অন্যান্য রাশির দ্বারা প্রকাশ করা যায় না, তাদের মূল একক বলা হয়। 
❏যে অন্য কোনো রাশির উপর নির্ভর করে না। যেমন, দৈর্ঘ্য, ভর, সময় ইত্যাদি। এদের মৌলিক বা প্রাথমিক রাশি বলে।
লব্ধ একক:-মূল একক দ্বারা যে সমস্ত রাশি গঠন করা হয় তাদের লব্ধ একক বলা হয়।
উদাহরণ হিসাবে বলা যায় দ্রুতি হল সময়ের সাথে সাথে দুরত্বের পরিবর্তন। এখানে দ্রুতির একক নির্ভর করে দূরত্ব এবং সময়ের এককের উপর এবং প্রকাশ করা হয় মিটার/সেকেণ্ড হিসাবে, যেখানে মিটার এবং সেকেণ্ড মূল একক।
❏যে রাশি একাধিক মৌলিক রাশি নিয়ে তৈরি করা হয়। যেমন, ক্ষেত্রফল, ঘনত্ব, আয়তন, বেগ ইত্যাদি। এদের লব্ধ রাশি বলে।
*একক প্রকাশের চারটি পদ্ধতি প্রচলিত। যথা ১.CGS বা মেট্রিক পদ্ধতি, ২. FPS বা ব্রিটিশ পদ্ধতি, ৩. MKS পদ্ধতি ও ৪. SI বা আন্তর্জাতিক একক পদ্ধতি। বর্তমানে CGS ও SI -এই দুটি পদ্ধতি বেশি ব্যবহৃত হয়।আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে 7টি মূল একক এবং ২টি সম্পূরক একক আছে।
❏প্রাথমিক রাশির একক হলো প্রাথমিক একক এবং লব্ধ রাশির একক হলো লব্ধ একক। যেমন সময় একটি প্রাথমিক রাশি। এতএব সময়ের একক 'সেকেন্ড' হলো প্রাথমিক একক। আবার বেগ একটি লম্ব রাশি। তাই বেগের একক 'মিটার/সেকেন্ড' একটি লব্ধ একক।
সম্পূরক একক:-
1. কোণের একক - রেডিয়ান (rad)
2. ঘনকোণের একক -স্টেরাডিয়ান (Sr)
মূল এককগুলি হল:- 

CGG, FPS ও MKS পদ্ধতিতে প্রাথমিক একক:- 
দৈর্ঘ্য: সেন্টিমিটার (cm)[CGS], ফুট (Fit) [FPS], মিটার (m) [MKS]
ভর: গ্রাম (g) [CGS], পাউন্ড (lb) [FPS], কিলোগ্রাম (kg) [MKS]
সময় : সেকেন্ড (s) [CGS, FPS, MKS]

রাশি:- পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিতে, রাশি হলো কোনো কিছু পরিমাপ করার জন্য ব্যবহৃত সংখ্যা বা সাংকেতিক চিহ্ন। রাশি দুই ধরনের হতে পারে - ভৌত রাশি এবং বীজগণিতীয় রাশি। ভৌত জগতে যা কিছু পরিমাপ করা যায়, যেমন দৈর্ঘ্য, ভর, সময় ইত্যাদি সবই ভৌত রাশি। বীজগণিতীয় রাশিতে সংখ্যা এবং প্রতীক ব্যবহার করা হয়, যেমন 5x, 2x + 3y ইত্যাদি। 
আরও বিশদভাবে:
ভৌত রাশি (Physical Quantity):- পদার্থবিজ্ঞানে, ভৌত রাশি হলো সেইসব রাশি যা পরিমাপ করা যায়। যেমন: দৈর্ঘ্য, ভর, সময়, বেগ, বল ইত্যাদি। 
বীজগণিতীয় রাশি (Algebraic Quantity):-বীজগণিতীয় রাশিতে সংখ্যা এবং প্রতীক ব্যবহার করা হয়। যেমন: 5x, 2x + 3y, x^2 ইত্যাদি। এখানে, 'x' একটি চলরাশি (variable) এবং 5, 2, 3 ইত্যাদি ধ্রুবক (constant)। 
সদিক রাশি বা ভেক্টর রাশি (Vector Quantity):-যে সকল ভৌত রাশিকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করার জন্য মান (magnitude) এবং দিক (direction) উভয়েরই প্রয়োজন হয়, তাদের সদিক রাশি বা ভেক্টর রাশি বলা হয়। যেমন: সরণ, বেগ, ত্বরণ, বল ইত্যাদি। 
যে সমস্ত ভৌত রাশির মান এবং দিক উভয়ই আছে তাদের ভেক্টর রাশি বলে। উদাহরণ: সরণ, বল, ত্বরণ ইত্যাদি।
স্কেলার রাশি (Scalar Quantity):-যে সকল ভৌত রাশিকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করার জন্য শুধুমাত্র মান (magnitude) প্রয়োজন, তাদের স্কেলার রাশি বলা হয়। যেমন: দৈর্ঘ্য, ভর, সময়, তাপমাত্রা ইত্যাদি।  
যে সমস্ত ভৌত রাশির শুধুমাত্র মান আছে কিন্তু কোনও নিক নেই তাদের স্কেলার রাশি বলা হয়। উদাহরণ: দৈর্ঘ্য, সময়,  ক্ষেত্রফল, ভর ইত্যাদি।

সূত্রঃ- √A2+B2+2AB Cosθ

কোন:- Cosθ=1

Cos30°=√3/√2

Cos45°=1/√2

Cos60°=1/2

Cos90°=0√

Cos120°=1/2

Cos180°= -1

কিছু সাধারণ ধারণা:- 
দূরত্ব:- কোনও একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনও বস্তু দ্বারা অতিক্রান্ত পথের দৈর্ঘ্যকে দূরত্ব বলা হয়।
দূরত্ব সর্বদা ধনাত্মক রাশি এবং এর একক মিটার (m), এটি স্কেলার রাশি।
সরণঃ- প্রাথমিক এবং অন্তিম অবস্থানের মধ্যে ন্যূনতম সরলরৈখিক দূরত্বকে সরণ বলা হয়।
গতিশীল বস্তুর একটি নির্দিষ্ট দিকে স্থান পরিবর্তনকে সরণ বলে। এটি একটি ভেক্টর রাশি।
এটি ঋণাত্মক, শূন্য বা ধনাত্মক হতে পারে। এর একক মিটার এবং এটি একটি ভেক্টর রাশি।
দ্রুতি (Speed):- সময়ের সাপেক্ষে কোনও বস্তুর দূরত্ব অতিক্রম করার হারকে দ্রুতি বলা হয়।
কোনো বস্তু একক সময়ে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে ওই বস্তুর দ্রুতি বলে। এটি একটি স্কেলার রাশি।
দ্রুতি =দূরত্ব/সময়
এটি স্কেলার রাশি এবং এর একক মিটার/সেকেন্ড।
গতিবেগ (Velocity): -সময়ের সাপেক্ষে কোনও বস্তুর সরণের হারকে বেগ বা গতিবেগ বলা হয়।
গতিবেগ = সরণ/ সময়
এটি ভেক্টর রাশি। একক হল m/s. এটি ঋণাত্মক, শূন্য বা ধনাত্মক হতে পারে।
সমবেগ:- কোনও বস্তু সমান সময়ের অবকাশে যদি সমান সরণ অতিক্রম করে তবে বলা হয় বস্তুটি সমবেগে গতিশীল।
অসমবেগ:- কোনও বস্তু সমান সময়ের অবকাশে যদি ভিন্ন ভিন্ন সরণ অতিক্রম করে তবে বলা হয় বস্তুটি অসমবেগে গতিশীল।
ত্বরণ:- বেগের পরিবর্তনের হারকে ত্বরণ বলা হয়। এটি ভেক্টর রাশি এবং একক হল মিটার/সেকেণ্ড2'। এর মান ঋণাত্মক, শূন্য বা ধনাত্মক হতে পারে।
যদি এর মান ধনাত্মক হয় তবে ত্বরণ বলা হয়। যদি মানটি শূন্য হয় তবে বলা হয় বস্তুটি সমবেগে গতিশীল এবং যদি মানটি ঋণাত্মক হয় তবে বলা হয় মন্দন।
স্থিতি:-  সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি কোনও বস্তু স্থান পরিবর্তন না করে তবে তার অবস্থাকে স্থিতি বলা হয়।
গাতি:- সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি কোনও বস্তু স্থান পরিবর্তন করে তবে তার অবস্থাকে গতি বলে।
প্রাথমিক বেগ ( Primary Velocity):- কোন বস্তুর প্রথমের যে থাকে সেই বেগ কে প্রাথমিক বেগ বলে। প্রাথমিক বেগ কে U আকারে প্রকাশ করা হয়।
অন্তিম বেগ ( Final Velocity):- কোন কথা বস্তুর শেষের যে বেগ সেই বেগ কে বলা হয় অন্তিম বেগ। অন্তিম বেগ V আকারে প্রকাশ করা হয়। 
Displacement=√AB২+BC২

বেগ ও দ্রুতির মধ্যে পার্থক্য 

বেগ (Velocity)দ্রুতি (speed) 
বেগের দিক আছে।দ্রুতির দিক নেয়।
বেগ ভেক্টর রাশি।দ্রুতি স্কেলার রাশি।
বেগ ঋণাত্বক ও ধনাত্মক হয়।দ্রুতি শুধু ধনাত্বক হয়।
বেগে dot product নেই।দ্রুতি তে dot product আছে।
বেগ একক km/h,m/sদ্রুতি একক km/h, m/s
কিছু গুরুত্বপূর্ণ একক:-
1 অ্যাস্ট্রম = 10-10m
1 মামইক্রোমিটার =10-9m = 10-6m
1 আলোকবর্ষ = 9.46 x 10-15m
1 অ্যাস্ত্রনমিক্যাল একক (AU) = 1.5 × 10¹¹m
1 পারসেক = 3.26 আলোকবর্ষ =3.083 x 10-16m
1 ফারমি =10-15m

গতির প্রকারভেদ:-
রৈখিক গতি:- কোনও বস্তু যদি সরলরেখা বরাবর, অনুভূমিকভাবে বা উল্লম্বভাবে গমন করে তবে তার গতিকে রৈখিক গতি বলা হয়। উদাহরণ-গাড়ির গতি, উঁচু স্থান থেকে ইটের পড়া ইত্যাদি।
কৌণিক গতি: যদি কোনও বস্তু বৃত্তাকার পথে গমন করে তাহলে কার গতিকে কৌণিক গতি বলা হয়। বৃত্তাকার পথে গতি সর্বদা ত্বরণ যুক্ত হয় এবং পরিমাপ করা হয় নিম্নলিখিতভাবে।
ত্বরণ=(গতিবেগ)২/ব্যাসার্ধ
সরল দোলগতি:- কোনও একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর সাপেক্ষে যদি কোনও বস্তু সরলরেখা বরাবর অগ্র ও পশ্চাৎ বরাবর গতিশীল থাকে তবে তার প্রতিটিকে সরল দোলগতি বলে। সরল দোলগতিসম্পন্ন কোনো কণার সাম্যাবস্থান থেকে সর্বাধিক সরণে স্থিতিশক্তি সর্বোচ্চ এবং গতিশক্তি শূন্য হয়।
সরল দোলগতিসম্পন্ন কোনো কণার সাম্যাবস্থানে গতিশক্তি সর্বোচ্চ ও স্থিতিশক্তি শূন্য হয়।
পর্যাবৃত্ত গতি :- নির্দিষ্ট সময় অন্তর কোনও বস্তু যদি তার গতিকে পুনরাবৃত্ত করে তবে তার গতিকে পর্যাবৃত্ত গতি বলা হয়।
দোলন গতি (Oscillatory Motion):- পর্যাবৃত্ত গতিসম্পন্ন কোনও কণা যদি বারবার একই পথ দিয়ে আসা যাওয়া করে তবে তার গতিকে দোলন গতি বলা হয়।
সরল দোলকঃ- একটি দীর্ঘ, ভারহীন ও অপ্রসার্য সুতোর সাহায্যে একটি দৃঢ় অবলম্বন থেকে একটি ছোট ভারী বস্তুকে ঝুলিয়ে যদি দোলানো সম্ভব হয় তবে সেই সংস্থাটিকে সরল দোলক বলা হয়।
সরল দোলকের পর্যায়কাল দোলকের কার্যকর দৈর্ঘ্য ও ঐ স্থানের অভিকর্ষজ ত্বরণের উপর নির্ভর করে।
কোনও সরল দোলকের পর্যায়কাল। 𝑡= 2𝖓√𝚤/g
দোলকের পিণ্ডের ভরের উপর সরল দোলকের পর্যায়কাল নির্ভর করে না।
প্রাসের গতি (Projectile Motion):- প্রাসের গতি হল এমন একপ্রকার গতি যেখানে কোনও বস্তু বা কণাকে পৃথিবীর পৃষ্ঠের সংলগ্ন ছুঁড়ে দিলে ঐ বস্তু বা কণাটি পৃথিবীর অভিকর্ষের প্রভাবে বক্রপথ অনুসরণ করে পড়বে। প্রাসের গতির সঞ্চারপথ সর্বদা অধিবৃত্তাকার।
সর্বাধিক সীমার জন্য প্রক্ষেপ কোণ 45° হতে হবে।
সর্বাধিক উচ্চতা আরোহণের জন্য প্রক্ষেপ কোণ 90° হতে হবে।
বিভিন্ন একক ও মাত্রাসমূহ:-
স্থির বস্তু:- যে বস্তু সময়ের সঙ্গে কোন স্থান পরিবর্তন করে না তাকে 'স্থির বস্তু' বলে। 
গতিশীল বস্তু:- যে বস্তুগুলো সময়ের সঙ্গে স্থান পরিবর্তন করে, তাদের বলে গতিশীল বস্তু।
বল:-কোন স্থির বস্তুকে গতিশীল করতে বা গতিশীল বস্তুর বেগ বাড়াতে, কমাতে বা শূন্য করে দিতে বা গতির দিক বদল করতে বাইরে থেকে ওই বস্তুর ওপর ক্রিয়া করতে হয়।
কোন গতিশীল ও স্থির বস্তুর ওপর ক্রিয়া বা কাজ করাকে বল বলে। 
বাইরে থেকে প্রযুক্ত যে কারণের ফলে স্থির বস্তু সচল হয় অথবা সমবেগ গতিশীল বস্তু থেমে যায় বা তার বেগ বা কমে বা বেগের দিক পরিবর্তন হয় অথবা ওই বস্তুর আকৃতি বা আয়তনের পরিবর্তন হয় সেই কারণকে  বলে বল (Force)।
SI পদ্ধতিতে বলের একক নিউটন অন্য আরেক পদ্ধতিতে বলের এক ডাইন।
চৌম্বক পদার্থ:- চুম্বক যে পদার্থ গুলির ওপর বল প্রয়োগ করতে পারে, সেই পদার্থগুলোকে চৌম্বক পদার্থ বলে। 
যেমন:- লোহা, নিকেল, কোবাল্ট ইত্যাদি। 
অভিকর্ষ বল:- যে বস্তুকে স্পর্শ না করে বল প্রয়োগ হয়, তাই হলো অভিকর্ষ বল। 
ওজন= বল তাই ওজন বা বলের SI পদ্ধতিতে একক হল নিউটন।
ত্বরণ:- বেগ বারতে অথবা কমতে থাকার সময় এক সেকেন্ডে ব্যাগ কতটা বাড়লো বা কতটা কমলো তার পরিমাপকে বলে ত্বরণ। 
বেগের মান যদি ধনাত্মক বা কমতে থাকে তখন ত্বরণ বা মন্দন হয় (Retadation) বলে।
কোন বস্তুর ওপর পরস্পর বিপরীত দিক থেকে থেমে সমমানের বল (Force) প্রয়োগ করলে, বস্তুটার ওপর 'সার্বিক বল' শূন্য হয়ে যায়।
বল :- বল প্রয়োগে বস্তুর গতি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ইংরেজ বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটন তিনটি সূত্র বলে গিয়েছেন।
চলো ওই সূত্রগুলো নিয়ে আলোচনা করি।
স্যার আইজাক নিউটন 1642 খ্রিস্টাব্দে 25 ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের উলসথর্প গ্রামে এক চাষির পরিবারে জন্ম। 1665 খ্রিস্টাব্দে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজ থেকে বি.এ. ডিগ্রি লাভ। 1669 খ্রিস্টাব্দে মাত্র 27 বছর বয়সে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদে যোগদান করেন। তাঁর গতিসূত্র, মহাকর্ষসূত্র, সূর্যরশ্মির বর্ণালি, আলোর কণিকাতত্ত্ব, দ্বিপদ উপপাদ্য, ক্যালকুলাস বিজ্ঞান ও গণিতের জগতে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। তিনি 1672 খ্রিস্টাব্দ থেকে টানা 25 বছর রয়‍্যাল সোসাইটির সভাপতির পদ অলংকৃত করেন। 1727 খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর লেখা বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ 'প্রিন্সিপিয়া'।
নিউটনের প্রথম গতিসূত্রের ধারণা:- কোনো বস্তুর ওপর যদি বাইরে থেকে বল প্রয়োগ না করা হয়, তাহলে-
(i) স্থির বস্তু চিরকাল স্থিরই থেকে যাবে,
(ii) আর গতিশীল বস্তু আগে থেকেই যে দিকে যে বেগ নিয়ে চলছিল সেদিকে সেই বেগ নিয়ে চিরকাল চলতে থাকে।
তাহলে দেখা গেল যে, বাইরে থেকে বল প্রয়োগ না করা হলে, কোনো স্থির বস্তু হয় চিরকাল স্থির, বা সমবেগে সরলরেখা বরাবর গতিশীল কোনো বস্তু চিরকাল ওই একই গতিতে একই সরলরেখা ধরে চলতে থাকে। স্থির থাকা বা একই বেগে চলতে থাকার এই ধর্মকে বলে বস্তুর জাড্য। স্থির থাকার ধর্মকে স্থিতিজাড্য। আর সমবেগে গতিশীল থাকার ধর্মকে গতিজাড্য বলা হয়। আর বাইরে থেকে যা প্রয়োগ করলে এই অবস্থা বদলে দেওয়া যায় তাকে বলে বল।
জাড্য,স্থিতিজাড্য,গতিজাড্য -এর ওপর বাইরে থেকে যা প্রয়োগ করলে এই অবস্থা বদলে দেওয়া যায় তাকে বলে বল।
আমাদের প্রতিদিনের জীবনে জাড্য
(1) স্থির বাস হঠাৎ চলতে আরম্ভ করলে কোনো কিছু না ধরে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী পিছনদিকে হেলে পড়ে। কোনো কিছু ধরে থাকা যাত্রীদেরও ওই একইরকম অনুভূতি হয়। থেমে থাকা বাসে যাত্রীরাও থেমে থাকে। সব কিছু তখন স্থির অবস্থায় রয়েছে। বাস হঠাৎ চলতে শুরু করল, ফলে বাসের স্থির অবস্থা পালটে গেল। বাসের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের পা চলতে শুরু করল কারণ পা বাসের মেঝের সংস্পর্শে আছে। কিন্তু যাত্রীদের বাকি শরীর স্থির থাকাতে চাইল। অতএব পায়ের সঙ্গে সঙ্গে এগোল না। যাত্রীরা তাই পিছনের দিকে হেলে পড়ল।
নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্রের ধারণা:- 
নিউটনের প্রথম গতিসূত্র থেকে আমরা জেনেছি, বাইরে থেকে 'বল' প্রয়োগ করা হলে একটি বস্তুর বেগ বদলে যায়। নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র অনুসরণ করে বলা যায়, (i) একটি নির্দিষ্ট ভরের বস্তুর ওপর প্রয়োগ করা বল যত বাড়ানো হবে. 1 সেকেন্ডে বস্তুটির বেগের পরিবর্তনও (অর্থাৎ ত্বরণ) তত বাড়বে। প্রযুক্ত বলের পরিমাণ দ্বিগুণ হলে, উৎপন্ন ত্বরণও দ্বিগুণ হবে। অর্থাৎ বল ও ত্বরণ এর মধ্যে সরল সম্পর্ক রয়েছে। (ii) বল প্রয়োগের অভিমুখ যে দিকে, উৎপন্ন ত্বরণের অভিমুখও সেই দিকে। অর্থাৎ প্রযুক্ত বলের দিকেই বস্তুর বেগ বৃদ্ধি পায়।
নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র অনুসরণ করে প্রযুক্ত বলের মান নির্ণয়ের সমীকরণ:-
প্রযুক্ত বল= বস্তুর ভর  × এক সেকেন্ডে বস্তুর বেগের পরিবর্তন
=বস্তুর ভর × বস্তুতে উৎপন্ন ত্বরণ (যেহেতু. 1 সেকেন্ডে বেগের পরিবর্তন =ত্বরণ)
F=m×a [F-বল, m-ভর, a- ত্বরণ]
SI পাতিতে বলের (Force) একক1নিউটন।
1নিউটন =1kg 1 মিটার/সেকেন্ড2।
নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্রের ধারণা:-
রেশমা দিদিমণির সঙ্গে গিয়েছিল কলকাতায়। বাড়িতে ফেরার পথে রেশমা যখন সবার শেষে লাফ দিয়ে নৌকা থেকে নামল তখন রেশমা অবাক হয়ে গেল কী আশ্চর্য, নৌকাটা জলে পিছিয়ে যাচ্ছে কেন। দিদিমণি বললেন, ভালো করে ভেবে দেখো, নৌকাটা তো আর এমনি এমনি সরে যায়নি।
রেশমা বলল, নিশ্চয়ই কেউ না কেউ নৌকাটাকে পিছনদিকে ঠেলে দিয়েছে। তবে কে ঠেলল। আমিই তো সব শেষে  নামলাম। তবে তুমিই বল প্রয়োগ করেছ। কারণ তুমি আর নৌকা ছাড়া সেখানে তৃতীয় কেউ তো ছিল না।
আমি তো লাফ দিয়ে নেমেছিলাম। ও বুঝতে পেরেছি আমি লাফ দিয়ে নামার সময় নৌকাটাকে তো পিছনদিকে ঠেলেছিলাম। ঠিক ধরেছ, ওই ঠেলাই নৌকাটাকে পিছনদিকে সরিয়ে দিয়েছে। তাহলে আমি কীভাবে সামনের দিকে লাগতে পারলাম? আমাকে তো কেউ সামনের দিকে ঠেলে দেয়নি।
দিদিমণি হেসে বললেন, তোমার প্রশ্নেই তোমার উত্তর লুকিয়ে আছে।
আমার প্রশ্নে কী উত্তর লুকিয়ে আছে দিদি, আর একটু পরিষ্কার করে বলবেন।
তার মানে তোমাকে কেউ ঠেলেছেই ঠেলেছে।
আমার পিছনে নৌকা ছাড়া আর তো কেউ ছিল না। তাহলে কি নৌকাটাই আমাকে ঠেলল।
একদম ঠিক। ওই নৌকাই, তোমার দেওয়া বলের ঠিক উলটো দিকে, সমান জোরে, তোমার পায়ে বলপ্রয়োগ করেছে। আর ওই বল তোমাকে সামনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ভারি মজার ব্যাপার তো। তাহলে আমি যেখানেই বল প্রয়োগ করি না কেন, সেও আমায় সমান জোরে আমার দেওয়া বলের উলটোদিকে বল প্রয়োগ করবে।
স্যার আইজাক নিউটন তাঁর তৃতীয় গতিসূত্রে সে কথাই তো বলেছেন।
কী রকম?
নিউটন বলেছেন' প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীতমুখী একটা প্রতিক্রিয়া বল আছে।'
তাহলে দিদি আমার আর নৌকার বলের মধ্যে কোনটা 'ক্রিয়া' আর কোনটা 'প্রতিক্রিয়া'।
আসলে ক্রিয়া আর প্রতিক্রিয়া ওভাবে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না। কারণ 'ক্রিয়া' আর 'প্রতিক্রিয়া' সবসময় একসঙ্গেই ঘটে। একটা আগে আর একটা পরে, এভাবে নয়। তাই যে-কোনো একটা 'ক্রিয়া' হলে, অন্যটা হবে তার 'প্রতিক্রিয়া'।
তাহলে দিদি এই 'ক্রিয়া' আর 'প্রতিক্রিয়া' আলাদা আলাদা বস্তুর উপর কাজ করে, তাই না।ঠিক ধরেছ, তোমার বল প্রয়োগ হয়েছে নৌকার ওপর, আর নৌকার বল প্রয়োগ হয়েছে তোমার পায়ের উপর।
নিউটনের গতির সূত্রাবলী
প্রথম সূত্রঃ- বাইরে থেকে প্রযুক্ত বল দ্বারা বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন করতে বাধ্য না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির এবং গতিশীল বস্তু চিরকাল সমবেগে সরলরেখা বরাবর গতিশীল থাকবে। এই সূত্রকে জাড্যের সূত্রও বলা হয়।
❏বাইরে থেকে কোনো বল প্রযুক্ত না হলে, স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে এবং সচল বস্তু চিরকাল সমগতিতে সরলরেখা বরাবর চলতে থাকবে।
এর প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন কোনও চলন্ত বাস হঠাৎ থামে তখন গতি জাড্যের জন্য আমরা সামনে ঝুঁকে পড়ি।
জাড্য, বলের সংজ্ঞা সম্বন্ধে নিউটনের প্রথম গতিসূত্র ধারণা দেয়।
উদাহরণ:-
 হঠাৎ কোনো গাড়ি স্টার্ট দিলে যাত্রীরা পেছনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। 
ম্যারাথন প্রতিযোগীরা ফিনিশ লাইনের বাইরে পর্যন্ত দৌড়ায়।
মাটিতে ঘূর্ণায়মান একটি বল অসীম পর্যন্ত তার গতির অবস্থা বজায় রাখবে, যদি কোনো বাহ্যিক শক্তি তার ওপর কাজ না করে।যখন একটি ছুটে চলা ঘোড়া থেমে যায়, এতে আরোহণকারী ব্যক্তি সামনের দিকে ঝুঁকে যায়।
দ্বিতীয় সূত্রঃ -কোনও বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার বস্তুর উপর প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক। 
কোনো বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার বস্তুটির ওপর প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক এবং বল যেদিকে প্রযুক্ত হয় ভরবেগের পরিবর্তন সেদিকে ঘটে। বল (P) = ভর (m) × ত্বরণ (f) ভরবেগের নিত্যতাসূত্র এই সুত্র থেকে পাওয়া যায়।
রৈখিক ভরবেগঃ- কোনও বস্তুর ভর এবং বেগের গুণফলকে ভরবেগ বলা হয়। যদি অন্তিম বেগ এবং প্রাথমিক বেগ হয় এবং বস্তুর ভর m হয় তবে
ভরবেগ একটি ভেক্টর রাশি কারণ বেগ একটি ভেক্টর রাশি এবং ভর একটি স্কেলার রাশি।
একই ভর এবং একই বেগ সহ দুটি বস্তুর সর্বদা একই ভরবেগ থাকবে। বলের SI একক হল কেজি মিটার/সেকেণ্ড 2' বা নিউটন।
বলের ঘাত: অতি অল্প সময়ের জন্য কোনও বস্তুর উপর কোনও বল প্রযুক্ত হলে সেই বল এবং সময়ের গুণফলকে বলের ঘাত বলা হয়।
নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র থেকে পাওয়া যায়,
বলের ঘাত = ভরবেগের পরিবর্তন
বলের ঘাতের SI একক হল N-S (নিউটন-সেকেণ্ড) 
ভরবেগ, ঘাত, বলের পরিমাপ সম্পর্কে নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র ধারণা দেয়।
তৃতীয় সূত্রঃ- প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বিপরীতমুখী।
প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া আছে।
কোনও বন্দুক থেকে বুলেট ছোঁড়া হলে নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র অনুযায়ী ব্যক্তিটি একটু পশ্চাৎভিমুখী হয়।
নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র এবং গ্রহ-উপগ্রহ সংক্রান্ত কেপলারের সূত্র:-
নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র:-মহাবিশ্বের যে-কোনো দুটি বস্তুকণা তাদের সংযোজক সরলরেখা বরাবর পরস্পরকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বলের মান বস্তুদুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
মহাকর্ষ বল হল সংরক্ষী বল (Conservative force)।
কেপলার-এর প্রথম সূত্র:--যে-কোনো গ্রহ উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে এবং সূর্য ওই উপবৃত্তের একটি ফোকাসে থাকে।
কেপলার-এর দ্বিতীয় সূত্র-সূর্য ও যে-কোনো গ্রহের সংযোজক সরলরেখাটি সমান সময়ের অবকাশে সমান ক্ষেত্রফল অতিক্রম করে।
কেপলার-এর তৃতীয় সূত্র-যে-কোনো গ্রহের সূর্যকে প্রদক্ষিণকালের (T) বর্গ সূর্য থেকে ওই গ্রহের গড় দুরত্বের (r) ঘনফলের সমানুপাতিক।



Post a Comment

Previous Post Next Post